২৯৫০ টাকায় ২ দিন কক্সবাজার ভ্রমণ

স্বল্প খরচে ভ্রমণ: ২৯৫০ টাকায় ২ দিন কক্সবাজার ভ্রমণ (যাতায়াত-থাকা-খাওয়া- ঘুরাঘুরিসহ)

Longest Sea Beach in the World

অবাক হওয়ার কিছু নেই। দুইমাস আগেই এই বাজেটে ২ দিনের ট্যুর দিয়ে এসেছি। প্রথমেই বলে নিচ্ছি ট্যুরের সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা ও গাইড লাইনটি সাজানো হয়েছে তাদের জন্য, যারা ভ্রমণপ্রেমী কিন্তু বাজেট সীমিত! বিশেষ করে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বা তরুণদের জন্যে।

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত বা তার আশেপাশের সৌন্দর্য্য নিয়ে লিখলে শেষ করা যাবেনা। তবে সীমিত বাজেটে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ছাড়াও ২ দিনে যা যা দেখতে পারবেন, খরচের বিস্তারিতসহ সেগুলোই লেখার চেষ্টা করবো। বলে রাখি, যারা এর আগে কখনো কক্সবাজার যাননি, লেখাটি তাদের জন্য সবচেয়ে বেশি সহায়ক হবে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য:

  • ন্যূনতম ৪ জনের একটি টিম হতে হবে।
  • ২ দিনের ট্যুর হবে।
  • যাতায়াত ট্রেনে করতে হবে এবং আসার টিকেট অগ্রিম কেটে নিতে হবে।                             

The Sun Set Beauty of the Beach (Cox Bazar)

                              দর্শনীয় স্থান: ২ দিনের ট্যুরে কক্সবাজারে যা যা দেখবেন –

        বিচ এলাকা :

      • কলাতলী বিচ
      • সুগন্ধ্যা বিচ
      • লাভনী বিচ
      • ঝাওবন এলাকা

        মেরিন ড্রাইভ সড়ক

      • ইনানী বিচ
      • হিমছড়ি
      • পাটোয়ারটেক বিচ
      • মেরিন ড্রাইভ সড়ক ইত্যাদি।                                                                 

ইনানী বিচ

                                                         ট্রেনে যাত্রা  

        মহানগর এক্সপ্রেস

      • রাত: ৯.২০ টু ভোর ৪.৫০
      • ভাড়া - শোভন চেয়ার ৩৪৫ টাকা।

অর্থাৎ কমলাপুর থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ট্রেন ছাড়বে রাত ৯:২০ এবং চট্টগ্রাম পৌছাবে ভোর ৪.৫০ (৩০ মিনিট বিলম্বে পৌছাতে পাড়ে)

       তূর্ণা এক্সপ্রেস-

      • ছাড়বে রাত ১১:৩০-পৌছাবে সকাল ৬.২০
      • ভাড়া - শোভন চেয়ার ৩৪৫ টাকা

এক্ষেত্রে আমি সাজেস্ট করবো মহানগর এক্সপ্রেসে যেতে। কারণ এটি তূর্ণার চেয়ে ২ ঘন্টা আগে পৌঁছাবে। যেহেতু মাত্র ২ দিনের ট্যুর হবে, তাই আপনাদের উচিত হবে কক্সবাজারের পুরো দুইদিন উপভোগ করা। অর্থাৎ মহানগরে গেলে আপনি সকাল ১০ টার ভিতরেই আপনারা কক্সবাজার থাকবেন।

      চট্টগ্রাম টু কক্সবাজার যাত্রা

      • সিএনজি রিজার্ভ -১০০
      • লেগুনা/অটো ভাড়া - ১৫-২০ টাকা (জন প্রতি)      

বিঃদ্র: স্টেশন থেকে বের হয়ে পাঁচ মিনিট সোজা হাটলেই লেগুনা যেখান থেকে ছাড়ে সেখানে পৌছে যাবেন!

                                                           বাস টার্মিনাল

আপনারা ভোর ৫.৩০ টার মধ্যেই বাস টার্মিনালে পৌছে যাবেন। সেখানে গিয়েও দেখবেন অসংখ্য বাস কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাচ্ছে। তবে আমার সাজেশন্স থাকবে মার্সা (MARCA) দিয়ে যাওয়ার। আমার অভিজ্ঞতা অনুসারে চট্রগ্রাম -কক্সবাজারের রোডের সবচেয়ে ভালো সার্ভিস দেয় বাসটি।

      বাসের নাম ও ভাড়া

      • MARCA-BUS
      • ২৫০ (জন প্রতি)

বিঃদ্র- মার্সা বাসটি আপনাকে কলাতলী বীচের পূর্বেই নামিয়ে দিবে (টার্মিনালে) । সেখান থেকে ৫০ টাকা অটো ভাড়া দিয়ে আপনাকে কলাতলী আসতে হবে।

                                                   হোটেল/কটেজ ভাড়া

কক্সবাজারের প্রতিটি বীচ সংলগ্ন এলাকায় আপনি অসংখ্য ছোট-বড় কটেজ/হোটেল পাবেন। যেহেতু আপনারা স্বল্প বাজেটে ট্যুর করবেন, তাই আমি সাজেস্ট করবো কটেজ এ উঠতে। আমি ২ টি কটেজের ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর নিচে দিয়ে দিবো। যাত্রার পূর্বে কথা বলে কনফার্ম হয়ে নিবেন।

বিঃদ্র- যত দরকষাকষি করতে পারবেন ভাড়া তত কমানো যাবে।

১। সী গাজীপুর রিসোর্ট- ৮০০ টাকা (সিঙ্গেল রোম)
      • কলাতলী পয়েন্ট
      • হোটেল উত্তরার পাশে।
      • মোবাইলঃ 01883-568953; 01709-57674
২। সোহাগ গেস্ট হাউজ- ৮০০ টাকা (সিঙ্গেল রোম)
      • সুগন্ধ্যা পয়েন্ট
      • মোবাইলঃ 01818-594025; 01775- 567546

এছাড়াও এই কটেজগুলোতে আপনারা ডাবল রুম পাবেন। ১১০০-১২০০ টাকার মধ্যে ভাড়া নিতে পারবেন। আপনারা চাইলে কক্সবাজার গিয়েও বিভিন্ন কটেজে দরকষাকষি করে উঠতে পারেন। এক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, রিসোর্টের /হোটেলের ভাড়াগুলো হয় দুপুর ১২ টা হতে পরের দিন দুপুর ১২ টা। অর্থাৎ আপনাদের ২ দিনের ট্যুরে ১ দিনের জন্য রিসোর্ট ভাড়া নিলেই হবে।

                                              খাবার খরচ: ২ দিন (জনপ্রতি)

যদিও খাবারের বিষয়টি প্রত্যেকের রুচিবোধের উপর নির্ভর করে, আমি চেষ্টা করেছি একটা মিনিমাম রেটে (যেহেতু কম বাজেটের ট্যুর) কিভাবে ভালো মানের খাবার খেতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করতে।

  • সকালের নাস্তা: ৫০ টাকা (ডিম/সবজি+পরোটা)
  • দুপুর- ২২০ টাকা (সামুদ্রিক মাছ+ভর্তা+ভাত+ডাল)
  • রাত- (খিচুড়ি /ডিম-১০০ টাকা)
      মোট=৩৭০x২=৭৪০ টাকা


                                                      ১ম দিন যা করতে পারেন..............

পাটুয়ারটেক বিচ

রিসোর্টে ওঠে যতদ্রুত ফ্রেশ হতে পারবেন, তত তাড়াতাড়ি সমুদ্রের দেখা পাবেন। আমার সাজেশন্স থাকবে প্রথমে কলাতলী পয়েন্টে তারপর সুগন্ধ্যা বীচে যাওয়ার।

বীচ থেকে ফিরে দুপুর ২ টার মধ্যে খাওয়া দাওয়া শেষ করুন। একটু বিশ্রাম নিয়ে ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে পড়ুন মুহুর্তগুলো বন্দি করতে। এক্ষেত্রে আমার সাজেশন্স থাকবে অবশ্যই বীচের পাশ দিয়ে হাটতে হাটতে লাভনী বীচের দিকে যাওয়ার। কলাতলী থেকে লাভনী বীচের দূরত্ব ২.৫ থেকে ৩ কিলোমিটার হতে পারে। কিন্তু এই সময়টুকো আপনার জীবনের সেরা মুহুর্ত হতে পারে। হাটতে হাটতে অবশ্যই ঝাঁওবন পর্যন্ত যাবেন। সেখানে গেলে আপনি অন্যরকম এক সৌন্দর্য্য উপলব্ধি করতে পারবেন।

যারা কেনাকাটা করতে পছন্দ করেন, তারা অবশ্যই বার্মিজ মার্কেটে যাবেন। সেখানে অসংখ্য বিদেশি (মায়ানমার এবং ভারতের) কসমেটিক, আচার, সাবান, জুতো, পাহাড়ীদের হাতে বুনো চাদর, শাল, এবং নানান ধরনের জিনিস পাবেন। দরকষাকষি করলে অল্প দামে কিনতে পারবেন।

  • লাভনী পয়েন্ট থেকে বার্মিজ মার্কেট অটো ভাড়া (রিজার্ভ) নিবে ৬০/৭০ টাকা।

১০ টার মধ্যে রাতের খাবার সেরে নিন। অতঃপর সন্ধ্যায় আবার বীচে ফিরে আসুন। আমি রাত ৩ টা পর্যন্ত বীচে ছিলাম, যদিও প্রতি ঘন্টায় ছাতার ভাড়া গুনতে হয়েছিলো ৩০ টাকা । তবে রাত বাড়ার সাথে সাথে আপনি অনুভব করবেন সাগরের বিশালতা ও অপার সৌন্দর্য্য।                                        

                                                                  ২য় দিন যা করতে পারেন.......

সুগন্ধ্যা বিচ

যেহেতু আজ সারাদিন ঘুরাঘুরির পর সন্ধ্যায় আপনাকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হবে তাই সকালে ঘুম থেকে উঠে সব ঘুছিয়ে নিন। মনে আছে তো দুপুর ১২.০০ রুম ছাড়ার কথা! তাই সকাল ৯ টার মধ্যে সবকিছু গুছিয়ে রুম ছেড়ে দিন এবং আপনাদের ব্যাগগুলো রিসিপশনে রেখে দিন। অন্যথায় ১২ টা বাজার পূর্বে তারাই আপনার ব্যাগগুলো রিসিপসনে এনে রাখবে। যাইহোক, ৯.৩০ টার ভিতর সকালের নাস্তা শেষে অটো ভাড়া করে বেরিয়ে পড়ুন মেরিন ড্রাইভ রোডের উদ্দেশ্যে।
  • অটো ভাড়া=১০০০-১৫০০ টাকার মধ্যে পেয়ে যাবেন। (পাটোয়ারটেক বীচ পর্যন্ত)মেরিন ড্রাইভ রোড এবং পার্শ্ববর্তী দর্শনীয় যে স্থান গুলো দেখবেন:
মেরিন ড্রাইভ রোডের একপাশে সমুদ্র এবং অন্যপাশে পাহাড়ের সৌন্দর্য্য উপলব্ধি করতে পারবেন। আমরা যখন গিয়েছিলাম, তখন মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে যে স্থানগুলো ভালো লেগেছে, সেখানে নেমেছি। যাত্রা পথে সবার আগে হিমছড়ি পড়বে !

হিমছড়ির বিপরীত পাশে (হিমছড়ি বিচ)
  • টিকেট- ৩০ টাকা (এখন বাড়তে পারে)
  • তারপর- ইনানী বীচ
  • তারপর- পাটুয়ারটেক বীচ
আমার সাজেশন্স থাকবে প্রথমে হিমছড়ি দেখার, তারপর মেরিন পাটুয়ারটেক বীচ দেখার এবং ফিরতি পথে ইনানী বীচ দেখা। কারণ মেরিন ড্রাইভ সড়কের প্রতিটি জায়গায় অসাধারণ। কিছু রেখে গেলে আর দেখে আসতে পারবেন না। আমরা এই ভুলটির জন্য হিমছড়ি দেখতে পাইনি।

পাটুয়ারটেক বিচ

যাইহোক, মাথায় রাখবেন, বিকাল ৫ টার মধ্যে কলাতলী পৌছাতে হবে। তাই যত দ্রুত সম্ভব, সব দেখে ফিরতি পথে ইনানী বীচের সৌন্দর্য্য উপভোগ করবেন। ইনানী বীচের পাশেই অনেক ছোট ছোট দোকান আছে। চাইলে এখান থেকেও কেনাকাটা করতে পারেন। বিকাল ৪ টায় ইনানী থেকে কলাতলীর দিকে রওয়ানা দিন।

বিঃদ্র- এক্ষেত্রে আপনাকে হয় হিমছড়ি অথবা ইনানী বীচের আশেপাশে দুপুরের খাবার খেয়ে নিতে হবে। চাইলে অটোর ড্রাইভারের কাছ থেকে সাজেশন্স নিতে পারেন কোথায় খেলে ভালো হবে।                                           

                                                                      ঢাকায় ফিরে আসার পালা

যদিও ভ্রমণটি মাত্র ২ দিনের পরিকল্পনায় সাজানো হয়েছে (অভিজ্ঞতার আলোকে), অধিকাংশ মানুষ ৩ দিন ট্যুর করেও এসব স্থানের দেখা পায়না। অধিকাংশ মানুষই মনে করেন, বীচের সৌন্দর্য্য ছাড়া কক্সবাজার আর কিছুই দেখার নেই! যা নিতান্তই বোকামি।

যাইহোক, চট্রগ্রাম থেকে রাত ১১ টায় তূর্ণা এক্সপ্রেস ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসবে। তাই আপনাকে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ৬ টায় কক্সবাজার থেকে বেরিয়ে পড়তে হবে। অন্যথায় জ্যাম থাকার কারণে আপনারা ১১ টার পূর্বে চট্টগ্রাম পৌছাতে পারবেন না।

এক্ষেত্রে আপনাকে কলাতলী মোড় থেকে অটো করে টার্মিনালে আসতে হবে। অতপর আবার মার্সার টিকেট কেটে নিতে হবে। আপনি যত দ্রুত চট্টগ্রাম পৌছাতে পারবেন, আপনার জন্য ততই মঙ্গলজনক হবে। অন্যথায় ট্রেন মিস করলে সারারাত স্টেশনে কাটাতে হবে। অর্থাৎ যেভাবে যাবেন, ঠিক সেভাবেই ফিরতে হবে।

                                                           ব্যতিক্রম

আপনারা চাইলে রাত ১০.০০ টা পর্যন্ত বীচের সৌন্দর্য্য উপভোগ করে বাসেও ঢাকায় ফিরতে পারেন। এক্ষেত্রে ঢাকামুখী বাসগুলোর কাউন্টার থেকে সকালেই অগ্রিম টিকেট কেটে রাখতে হবে। তবে এক্ষেত্রে আপনাকে একটু বেশি ভাড়া গুনতে হবে। যেমন- ৮০০-৯০০ টাকা (নন এসি)।

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

                                                    খরচের সারাংশঃ জনপ্রতি খরচ
ঢাকা টু কক্সবাজার
  • যাওয়া আসা ৬০০×২=(১২০০+১০০=১৩০০) টাকা (অটোভাড়া সহ)
  • ৬ বেলা খাবার = ৭৫০ টাকা (২ দিন)
  • রুম ভাড়া= ৪০০ টাকা (শেয়ারে), ১ রাত, ২ দিন (পরদিন দুপুর ১২ টা পর্যন্ত)
  • মেরিন ড্রাইভ রোড ও পার্শ্ববর্তী হিমছড়ি, ইনানী ও পাটুয়ারটেক ভ্রমণে ৪ জনের টিমে জনপ্রতি খরচ পড়বে- ৩৫০ টাকা।
  • অন্যান্য কিছু হিডেন খরচ হতে পারে =১৫০ (কেনাকাটা ও ব্যক্তিগত খরচ ব্যতীত)সর্বমোট=২৯৫০//

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

স্লোগানঃ কম বাজেটে ট্যুরের জন্য আপনার আগ্রহ,  মানিয়ে নেওয়ার মনোভাব আর অল্প অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট।

এর বাহিরে যে কোন তথ্যের প্রয়োজন হলে কিংবা নতুন কোন স্থানের ভ্রমণ সংক্রান্ত তথ্যের জন্য কমেন্ট করুন। মেইল করতে পারেন- theultimatewatchmen@gmail.com এই ঠিকানায় ।



No comments

Powered by Blogger.